আল্লাহ তা’আলার পরিচয় (পর্বঃ ২)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন

হাফেয নেছার উদ্দীন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ৩ || পর্বঃ৪


  • কুফরের সংজ্ঞা

যে মানুষের কথা উপরে বলা হলো, তার মোকাবিলায় রয়েছে আর এক শ্রেণির মানুষ। সে মুসলিম হয়েই পয়দা হয়েছে এবং না জেনে, না বুঝে জীবনভর মুসলিম হয়েই থেকেছে। কিন্তু নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সে আল্লাহকে চেনেনি এবং নিজের নির্বাচন ক্ষমতার সীমানার মধ্যে সে আল্লাহর আনুগত্য করতে অস্বীকার করেছে। এ ধরনের লোক হচ্ছে কাফের। কুফর শব্দটির আসল অর্থ হচ্ছে কোন কিছু ঢেকে রাখা বা গোপন করা। এ ধরনের লোককে কাফের (গোপনকারী) বলা হয়, কারণ সে তার আপন স্বভাবের উপর ফেলেছে অজ্ঞতার পরদা। সে পয়দা হয়েছে ইসলামি স্বভাব নিয়ে। তার সারা দেহ ও দেহের প্রতিটি অঙ্গ কাজ করে যাচ্ছে ইসলামি স্বভাবের উপর। তার পারিপার্শ্বিক সারা দুনিয়া চলছে ইসলামের পথ ধরে। কিন্তু তার বুদ্ধির উপর পড়েছে পরদা। সারা দুনিয়ার এবং তার নিজের সহজাত প্রকৃতি সরে গেছে তার দৃষ্টি থেকে। সে এ প্রকৃতির বিপরীত চিন্তা করেছে। তার বিপরীতমুখী হয়ে চলবার চেষ্টা করেছে। এখন বুঝা গেল, যে মানুষ কাফের, সে কত বড় বিভ্রান্তিতে ডুবে আছে।

কুফরের অনিষ্ট

কুফর হচ্ছে এক ধরনের মূর্খতা, বরং, কুফরই হচ্ছে আসল ও নিখাদ মূর্খতা। মানুষ আল্লাহকে না চিনে অজ্ঞ হয়ে থাকলে তার চেয়ে বড় মূর্খতা আর কি হতে পারে ? এক ব্যক্তি দিন-রাত দেখেছে, সৃষ্টির এত বড় বিরাট কারখানা চলেছে, অথচ সে জানে না, কে এ কারখানার স্রষ্টা ও চালক। কে সে কারিগর, যিনি কয়লা, লোহা, ক্যালশিয়াম, সোডিয়াম ও আরো কয়েকটি পদার্থ মিলিয়ে অস্তিত্বে এনেছেন মানুষের মত অসংখ্য অতুলনীয় সৃষ্টিকে ? মানুষ দুনিয়ার চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে পাচ্ছে এমন সব বস্তু ও কার্যকলাপ, যার ভিতরে রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিতবিদ্যা, রসায়ন ও জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অপূর্ব পূর্ণতার নিদর্শন, কিন্তু সে জানে না, অসাধারণ সীমাহীন জ্ঞান বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ কোন সে সত্তা চালিয়ে যাচ্ছেন সৃষ্টির এ সব কার্যকলাপ। ভাবা দরকার যে মানুষ জ্ঞানের প্রাথমিক স্তরের খবরও জানে না, কি করে তার দৃষ্টির সামনে উন্মুক্ত হবে সত্যিকার জ্ঞানের তোরণ-দ্বার ? যতই চিন্তা-ভাবনা করুক, যতই অনুসন্ধান করুক-সে কোন দিকেই পাবে না সরল সঠিক নির্ভরযোগ্য পথ। কেননা তার প্রচেষ্টার প্রারম্ভ ও সমাপ্তি সব স্তরেই দেখা যাবে অজ্ঞতার অন্ধকার। কুফর একটি জুলুম, বরং সব চেয়ে বড় জুলুমই হচ্ছে এ কুফর। জুলুম কাকে বলে ? জুলুম হচ্ছে কোন জিনিস থেকে তার সহজাত প্রকৃতির খেলাপ কাজ জবরদস্তি করে আদায় করে নেয়া। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুনিয়ার যত জিনিস রয়েছে, সবই আল্লাহর ফরমানের অনুসারী এবং তাদের সহজাত প্রকৃতি (ফিতরাত) হচ্ছে ইসলাম অর্থাৎ আল্লাহর বিধানের আনুগত্য। মানুষের দেহ ও তার প্রত্যেকটি অংশ এ প্রকৃতির উপর জন্ম নিয়েছে। অবশ্য আল্লাহ এসব জিনিসকে পরিচালনা করবার কিছুটা স্বাধীনতা মানুষকে দিয়েছেন কিন্তু প্রত্যেকটি জিনিসের সহজাত প্রকৃতির দাবি হচ্ছে এই যে, আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি কুফর করছে সে তাকে লাগাচ্ছে তার প্রকৃতি বিরোধী কাজে। সে নিজের দিলের মধ্যে অপরের শ্রেষ্ঠত্ব, প্রেম ও ভীতি পোষণ করবে। সে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আর দুনিয়ায় তার আধিপত্যের অধীন সব জিনিসকে কাজে লাগাচ্ছে আল্লাহর ইচ্ছা বিরোধী উদ্দেশ্য সাধনের জন্য, অথচ তাদের প্রকৃতির দাবি হচ্ছে তাদের কাছ থেকে আল্লাহর বিধান মুতাবিক কাজ আদায় করা। এমনি করে যে লোক জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রত্যেকটি জিনিসের উপর, এমন কি নিজের অস্তিত্বের উপর ক্রমাগত জুলুম করে যাচ্ছে, তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে ?

কুফর কেবল জুলুমই নয় ; বিদ্রোহ, অকৃতজ্ঞতা ও নিমকহারামিও বটে। ভাবা যাক, মানুষের আপন বলতে কি জিনিস আছে। নিজের মস্তিষ্ক সে নিজেই পয়দা করে নিয়েছে না আল্লাহ পয়দা করেছেন ? নিজের দিল, চোখ, জিহ্বা, হাত-পা, আর সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবকিছুর স্রষ্টা সে নিজে না আল্লাহ ? তার চার পাশে যত জিনিস রয়েছে, তার স্রষ্টা মানুষ না আল্লাহ ? এসব জিনিস মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী করে তৈরি করা এবং মানুষকে তা কাজে লাগাবার শক্তি দান করা কি মানুষের নিজের না আল্লাহর কাজ ? সকলেই বলবে, আল্লাহরই এসব জিনিস, তিনিই এগুলো পয়দা করেছেন, তিনিই সবকিছুর মালিক এবং আল্লাহর দান হিসেবেই মানুষ আধিপত্য লাভ করেছে এসব জিনিসের উপর। আসল ব্যাপার যখন এই, তখন যে লোক আল্লাহর দেয়া মস্তিষ্ক থেকে আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীত চিন্তা করার সুবিধা আদায় করে নেয়, তার চেয়ে বড় বিদ্রোহী আর কে ? আল্লাহ তাকে চোখ, জিহ্বা, হাত-পা এবং আরো কত জিনিস দান করেছেন, তার সব কিছুই সে ব্যবহার করেছে আল্লাহর পছন্দ ও ইচ্ছা বিরোধী কাজে।

যদি কোন ভৃত্য তার মনিবের নিমক খেয়ে তার বিশ্বাসের প্রতিকুল কাজ করে, তবে তাকে সকলেই বলবে নেমকহারাম। কোন সরকারী অফিসার যদি সরকারের দেয়া ক্ষমতা সরকারের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে থাকে, তাকে বলা হবে বিদ্রোহী। যদি কোন ব্যক্তি তার উপকারী বন্ধুর সাথে প্রতারণা করে, সকলেই বিনা দ্বিধায় তাকে বলবে অকৃতজ্ঞ

কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা ও অকৃতজ্ঞতার বাস্তবতা কতখানি ? মানুষ মানুষকে আহার দিচ্ছে কোত্থেকে ? সে তো আল্লাহরই দেয়া আহার। সরকার তার কর্মচারীদেরকে যে ক্ষমতা অর্পণ করে, সে ক্ষমতা এলো কোত্থেকে ? আল্লাহই তো তাকে রাজ্য পরিচালনার শক্তি দিয়েছেন। কোন উপকারী ব্যক্তি অপরের উপকার করছে কোত্থেকে ? সবকিছুই তো আল্লাহর দান। মানুষের উপর সবচেয়ে বড় হক বাপ-মার। কিন্তু বাপ-মার অন্তরে সন্তান বাৎসল্য উৎসারিত করেছেন কে ? মায়ের বুকে স্তন দান করেছেন কে ? বাপের অন্তরে কে এমন মনোভাব সঞ্চার করেছেন ? যার ফলে তিনি নিজের কঠিন মেহনতের ধন সানন্দে একটা নিষ্ক্রিয় মাংসপিণ্ডের জন্য লুটিয়ে দিচ্ছেন এবং তার লালন পালনের ও শিক্ষার জন্য নিজের সময়, অর্থ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কোরবান করে দিচ্ছেন ?

যে আল্লাহ মানুষের আসল কল্যাণকারী, প্রকৃত বাদশাহ, সবার বড় পরওয়ারদেগার, মানুষ যদি তাঁর প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করে, তাঁকে আল্লাহ বলে না মানে, তাঁর দাসত্ব অস্বীকার করে, আর তার আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে গুরুতর বিদ্রোহ, অকৃতজ্ঞতা ও নিমকহারামি আর কি হতে পারে। কখনও মনে করা যেতে পারে না যে, কুফরি করে মানুষ আল্লাহর কোন অনিষ্ট করতে পারছে। যে বাদশার সাম্রাজ্য এত বিপুল-বিরাট যে বৃহত্তম দূরবীন লাগিয়েও আমরা আজও স্থির করতে পারিনি কোথায় তার শুরু আর কোথায় শেষ। যে বাদশাহ এমন প্রবল প্রতাপশালী যে তাঁর ইশারায় আমাদের এ পৃথিবী, সূর্য, মঙ্গলগ্রহ এবং আরো কোটি কোটি গ্রহ-উপগ্রহ বলের মত চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে ; যে বাদশাহ এমন অফুরন্ত সম্পদশালী যে, সারা সৃষ্টির আধিপত্যে কেউ তার অংশীদার নেই ; যে বাদশাহ এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল যে সবকিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী অথচ তিনি কারুর মুখাপেক্ষী নন, মানুষের এমন কি অস্তিত্ব আছে যে তাকে মেনে বা না মেনে সেই বাদশার কোন অনিষ্ট করবে ? কুফর ও বিদ্রোহের পথ ধরে মানুষ তাঁর কোন ক্ষতি করতে পারে না, বরং নিজেই নিজের ধ্বংসের পথ খোলাসা করে। কুফর ও নাফারমানীর অবশ্যম্ভাবী ফল হচ্ছে এই যে, এর ফলে মানুষ চিরকালের জন্য ব্যর্থ ও হতাশ হয়ে যায়। এ ধরনের লোক জ্ঞানের সহজ পথ কখনও পাবে না, কারণ যে জ্ঞান আপন স্রষ্টাকে জানে না, তার পক্ষে আর কোন জিনিসের সত্যিকার পরিচয় লাভ অসম্ভব। তার বুদ্ধি সর্বদা চালিত হয় বাঁকা পথ ধরে। কারণ, সে তার স্রষ্টার পরিচয় লাভ করতে গিয়ে ভুল করে, আর কোন জিনিসকে সে বুঝতে পারে না নির্ভুলভাবে। নিজের জীবনের প্রত্যেকটি কার্যকলাপে তার ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা অবধারিত। তার নীতিবোধ, কৃষ্টি, সমাজ ব্যবস্থা, তার জীবিকা অর্জন পদ্ধতি, শাসন পরিচালন ব্যবস্থা ও রাজনীতি- এক কথায়, তার জীবনের সর্ববিধ কার্যকলাপ বিকৃতির পথে চালিত হতে বাধ্য। দুনিয়ার বুকে সে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, অত্যাচার উৎপীড়ন করবে, বদখেয়াল অন্যায়-অনাচার ও দুষ্কৃতি দিয়ে তার নিজের জীবনকেই করে তুলবে তিক্ত-বিস্বাদ। তারপর এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে সে যখন আখেরাতে পৌঁছবে, তখন জীবনভর যেসব জিনিসের উপর সে জুলুম করে এসেছে, তারা তার বিরুদ্ধে নালিশ করবে। তার মস্তিষ্ক, দিল, চোখ, তার কান, হাত-পা-এক কথায়, তার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহর আদালতে অভিযোগ করে বলবে : এ আল্লাহদ্রোহী জালিম তার বিদ্রোহের পথে জবরদস্তি করে আমাদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিয়েছে। যে দুনিয়ার বুকে সে নাফরমানির সাথে চলেছে ও বসবাস করেছে, যে জীবিকা সে অবৈধ পন্থায় অর্জন করেছে, যে সম্পদ সে হারাম পথে রোজগার করে হারামের পথে ব্যয় করেছে, অবাধ্যতার ভিতর দিয়ে যে সব জিনিস সে জবরদখল করেছে, যেসব জিনিস সে তার বিদ্রোহের পথে কাজে লাগিয়েছে, তার সবকিছুই ফরিয়াদি হয়ে হাজির হবে তাঁর সামনে এবং প্রকৃত ন্যায় বিচারক আল্লাহ সেদিন মজলুমদের প্রতি অন্যায়ের প্রতিকারে বিদ্রোহীকে দেবেন অপমানকর শাস্তি।

বিশাল ঊর্ধ্ব-জগৎ ও গ্যলাক্সি

ঊর্ধ্ব-জগৎ বা মহাশূন্য সম্পর্কে আজ প্রতিটি শিক্ষিত লোকই জানে। সে এক বিশাল জগৎ। যাকে বলা হয় গ্যলাক্সি। বৈজ্ঞানিকগণ এই সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছে, তা আল্লাহর সৃষ্টিজগতের তুলনায় ক্ষুদ্র একটি বালু-কণার চেয়েও নগণ্য। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। বৈজ্ঞানিকদের বিশ্বাস এ বিশাল গ্যলাক্সিতে এমন সব বৃহদাকার তারকারাজি রয়েছে যার আলো আজও পৃথিবীতে এসে পৌঁছে নি। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে যে, এ ধরনের বৃহদাকার লক্ষ লক্ষ তারকারাজিকে গিলে ফেলতে পারে, এ ধরনের অসংখ্য কূপ রয়েছে এ গ্যলাক্সিতে। যার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা কোরআনে ইঙ্গিত করে বলেছেন :

فَلَا أُقْسِمُ بِمَوَاقِعِ النُّجُومِ ﴾ وَإِنَّهُ لَقَسَمٌ لَوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ (الواقعة: 75-76

আমি এ তারকারাজির অস্তাচলের শপথ করছি, নিশ্চয়ই এটা এক মহা শপথ। যদি তোমরা জানতে পার।” (সুরা ওয়াকেয়া, আয়াত: ৭৫-৭৬)

সৌরজগৎ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সূর্যকেই নেয়া যাক। মুনিরুদ্দিন আহমাদের এর লেখা বিস্ময়কর তথ্য সংবলিত একটি গ্রন্থ প্রজন্মের প্রহসন থেকে এই উদ্ধৃতিগুলো এখানে পেশ করছি-

সূর্য একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড

সমগ্র সৌরজগতের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এই সূর্য। বলতে গেলে গোটা সৌরজগৎটা সূর্যকে কেন্দ্র করেই ঘোরা-ফিরা করে, কিন্তু আমরা যারা নিত্য এই জ্বলন্ত প্রদীপটাকে দেখি, এর সম্পর্কে কতটুকুই বা জানি। সকালে সূর্যের আলো দেখি, এক পর্যায়ে আবার আলোকে ডুবে যেতে দেখি, শীতের সকালে তা আমাদের আরাম দেয়। আবার গ্রীষ্মের প্রখরতায় তা থেকে আমরা বাঁচার চেষ্টা করি, সব মিলে এটুকুই হচ্ছে আমাদের সাথে তার সম্পর্ক। সূর্য হচ্ছে এ বিশাল সৃষ্টিজগতের একটি সাধারণ নক্ষত্র, তার প্রখরতা ও উষ্ণতাকে কোনদিনই কোন মানবীয় জ্ঞান পরিমাপ করতে পারেনি। প্রতি সেকেন্ডে ৪০ লক্ষ টন হাইড্রোজেন এর থেকে ছিটকে পড়ছে এমন সব তারকালোকে, যার তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পৃথিবীর বুকে মানব-সভ্যতার বিকাশের প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত মানবকুল যতো এনার্জি ব্যয় করেছে তার চেয়ে দশগুণ বেশি এনার্জি প্রতি সেকেন্ডে সূর্য তার চারদিকে বিতরণ করে যাচ্ছে। যে গতিতে সূর্য তার হাইড্রোজেন ছড়াচ্ছে, তা একটি হাইড্রোজেন বোমার তুলনায় ১০ কোটি গুণ বেশি ক্ষমতা ও গতিসম্পন্ন। প্রতি সেকেন্ডে সূর্য তার আশে-পাশে যে হিলিয়াম’ নামক তরল গ্যাস তৈরি করছে, তার পরিমাণ হচ্ছে ৫৬০৪ কোটি টন। এর শক্তি ও প্রখরতা এতো বেশি যে, যদি এর সামান্যতমও এই ভূমণ্ডলের কোথাও গিয়ে পড়ে, তাহলে তার ১০০ মাইলের ভেতর কোনো জীবজন্তু থাকলে তা জ্বলে ছাই-ভস্ম হয়ে যাবে। এই জ্বলন্ত সূর্যের সম্মুখ ভাগ থেকে প্রতি সেকেন্ডে আর একটি জ্বালানি গ্যাস নির্গত হয়, বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন স্পাইকুলাস’।এই গ্যাসের গতি হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ হাজার মাইল। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, এক অদ্ভুত বিকর্ষণশক্তি তাকে মুহূর্তেই আবার সূর্যের কোলে ছুঁড়ে মারে। এই যে অকল্পনীয় ও অস্বাভাবিক জ্বলন্ত আগুনের কুণ্ডলী বানিয়ে রাখা হয়েছে, যার একটি অনু-পরমাণুও যদি ভূ-গোলকে সরাসরি ধাক্কা লাগে, তাহলে গোটা পৃথিবীটাই জলে-পুড়ে ছাই-ভস্ম হয়ে যাবে বলে আধুনিক বিজ্ঞানীরা বলছেন। কিন্তু পৃথিবীর বুকে আলো বিতরণ করে একে ফলে-ফুলে সাজিয়ে দেয়ার এ আয়োজনটুকু করেছেন কে ? কে এই মহা শক্তিধর, একে এর ধ্বংসক্রিয়ার বদলে গড়ার কাজে লাগিয়ে রেখেছেন যিনি?

মানবীয় শরীর একটি ক্ষুদ্র জগৎ

মূলত: মানুষকে এ ব্যাপারে অতি সামান্যই জ্ঞান দান করা হয়েছে। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি-ইত্যাদি ছোট ছোট মাত্র কয়েকটির খবর তারা জানে, যা সমুদ্র হতে পাখির ঠোঁটে করে উঠানো এক ফোটা পানির চেয়েও নগণ্য। আজ বৈজ্ঞানিকগণ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা সত্যই বলেছেন

– وَمَا أُوتِيتُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا(الإسراء: 85

তোমাদের খুব সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। (সুরা বনী ইসরাইল: ৮৫)

বিশ্বচরাচর ও ব্যক্তিসত্তা উভয়ের মধ্যে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শনাবলী রয়েছে। বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে কুদরতের অনেক নিদর্শন আছে এবং আছে তোমাদের মধ্যেও। তোমরা কি অনুধাবন করবে না ? (সূরা যারিয়াত আয়াত ২০/২১) এখানে নিদর্শনাবলীর বর্ণনায় আকাশ ও সৌরজগতের সৃষ্টির কথা বাদ দিয়ে কেবল ভূপৃষ্ঠের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, এটা মানুষের খুব নিকটবর্তী এবং মানুষ এর উপর বসবাস ও চলাফেরা করে। আলোচ্য আয়াতে এর চাইতেও নিকটবর্তী খোদ মানুষের ব্যক্তিসত্তার প্রতি তার দৃষ্টি আকৃষ্ট করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে ভূ-পৃষ্ঠে ও ভূ-পৃষ্ঠের সৃষ্ট বস্তু বাদ দাও, খোদ তোমাদের অস্তিত্ব, তোমাদের দেহ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে চিন্তা- ভাবনা করলে তোমরা এক একটি অঙ্গকে আল্লাহ তা‘আলার কুদরতের এক একটি পূর্ণাঙ্গ পুস্তক হিসাবে দেখতে পাবে। তোমরা সহজেই হৃদয়ংগম করতে সক্ষম হবে যে, সমগ্র বিশ্বে কুদরতের যে নিদর্শন রয়েছে, সেইসব যেন মানুষের ক্ষুদ্র অস্তিত্বের মধ্যে সংকুচিত হয়ে রয়েছে। এ কারণেই মানুষের। অস্তিত্বকে ক্ষুদ্র একটি জগৎ বলা হয়। সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টান্ত মানুষের অস্তিত্বের মধ্যে এসে স্থান লাভ করেছে। মানুষ যদি তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমগ্র অবস্থা পর্যালোচনা করে, তবে সে দৃষ্টির সামনে আল্লাহ তা‘আলাকে সদা উপস্থিত দেখতে পাবে। আসুন এবার তা হলে বেশি দুরে নয় একেবারেই নিজ দেহটার প্রতি দৃষ্টি দেয়া যায়। “প্রজন্মের প্রহসন” থেকে এ প্রসঙ্গের আর একটি উদ্ধৃতি এখানে পেশ করা গেল।

মানব শরীর সত্যিই এক অভূতপূর্ব মেশিন। এমন এক মেশিন যার যথার্থ বর্ণনা পেশ করা কোন দিনই কোন মানব সন্তানের পক্ষে সম্ভব নয়। আর সম্ভব হবেই বা কি করে, এই শরীর তো কোন মানুষ নিজে বানায়নি যে, সে তার নিজস্ব সৃষ্টির যাবতীয় তথ্য ও তত্ত্ব আপনাকে বলে দেবে। এই দেহের অভ্যন্তরীণ পরিশীলনের কথাই ধরুন না কেন, আমাদের হার্ট প্রতি মিনিটে ১০ পাউন্ড রক্ত সঞ্চালন করে, ব্যায়ামের সময় হার্টের এই রক্ত- সঞ্চালনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ পাউন্ডে। আমাদের শরীরে যতো রগ, শিরা-উপশিরা রয়েছে তার সবগুলোকে বাইরে এনে একটার সাথে জড়িয়ে লম্বা করতে থাকলে এর পরিমাণ হবে ৬০ হাজার মাইল। অর্থাৎ একটি মানুষের শরীরে শিরা-উপশিরা দিয়ে একজন মানুষ গোটা পৃথিবী প্রায় ৩ বার ঘুরে আসতে পারবে। সাধারণত: মানুষের শরীরে ৬ থেকে ১০ পাউন্ড রক্ত সর্বদা মওজুদ থাকে। রক্তের আবার দু,ধরনের রক্ত-কণিকা। কিছু আছে রেড সেল (লাল কণিকা) যা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বহন করে। কিছু আছে হোয়াইট সেল (সাদা কণিকা) যার কাজ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ রোগের প্রতিরোধ করা।

তা নিম্নরূপ :—

এক একজন মানুষের রক্তে রেড সেলের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি আর হোয়াইট সেল হচ্ছে আড়াই শত কোটি। অধিকাংশ হোয়াইট সেলের জীবনকাল হচ্ছে মাত্র ১২ ঘণ্টা, রেড সেলগুলো পরিমাণে একটু বেশিই বাঁচে, কোন কোন সেল ১২০ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে। একজন মানুষের শরীরে রক্ত চলাচলের জন্য যে শিরা বানানো হয়েছে, তার সবগুলোকে পাশাপাশি সাজালে দেড় একর জমির প্রয়োজন হবে। এর সব শিরাগুলো কিন্তু আবার একত্রে খোলা রাখা হয় না। তা হলে এক সেকেন্ডের চেয়েও কম সময়ের মধ্যে সমস্ত রক্ত শরীর থেকে বেরিয়ে আসবে। এই শরীরের একটি অংশ যেখানে সর্বদাই রক্তের প্রয়োজন, তা হচ্ছে ফুসফুস।তার উপশিরাগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সেখানকার রক্তকে পরিশুদ্ধ করে। গড়ে একজন মানুষ সারা জীবনে ৫০ কোটি বার শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে। এই যে রক্তের কথা বললাম তা কী? রক্ত হচ্ছে পনির চেয়ে ঘন একটি পদার্থ, যদিও মানুষের শরীরের ৬০ ভাগই হচ্ছে পনি। এর পরিমাণ গড়ে ১০ গ্যালন। সেই হিসেবে রক্তের পরিমাণ হচ্ছে শতকরা ১০ ভাগ। মানুষের শরীরে আরো বহু ধরনের উপাদান রয়েছে। যেমন মানব দেহে এতো চর্বি আছে, যা দিয়ে ৭টি বড়ো জাতের কেক বানানো যাবে। এই পরিমাণ কার্বন, আছে যে, তা দিয়ে ২৮ পাউন্ড ওজনের এক ব্যাগ কেক বানানো যাবে। এত পরিমাণ ফসফরাস আছে যে, তা দিয়ে ২২ শত ম্যাচ বনানো যাবে। এই সব মিলে মানুষ্য শরীরটা হচ্ছে এক বিচিত্র সংগ্রহ-শালা। এখানে সব কেমিক্যাল আবার একত্রে না থাকলে তাতে নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়।

যেমন মানুষের খাবারে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ আয়োডিন না থাকে, তাহলে তার গলদেশের নিম্ন-ভাগ আস্তে আস্তে বড় হতে থাকবে, পরে এতে মারাত্মক ধরনের রোগ (goitr) দেখা দেবে। একটি শিশুর যখন জন্ম হয় তখন তার শরীরে হাড়ের পরিমাণ থাকে ৩০০৫টি। পরে অবশ্য এক দুটো মিশে পরিমাণ কমে তা ২০৬ এ দাঁড়ায়। ৬৫০টি পেশির দ্বারা হাড়গুলো বেঁধে রাখা হয়। গিরার পরিমাণ একশত। পেশির সাথে যেখানে হাড়ের সম্মিলন ঘটে, তা থাকে অত্যন্ত শক্তিশালী। তার প্রতি বর্গইঞ্চি পরিমাণ জায়গার উপর কমপক্ষে ৮ হাজার কেজির মতো বোঝা সহজেই চাপানো যেতে পারে। এই আশ্চর্যজনক মেশিনটাকে ঢেকে রাখা হয়েছে একটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত পোশাক দ্বারা, যার নাম হচ্ছে চামড়া। গড়ে একজন মানুষের শরীরে এই চামড়ার পরিমাণ হচ্ছে ২০ বর্গফুট। এর উপরিভাগে আবার রয়েছে এক কোটি লোমকূপ। আমাদের রুচিবোধের জন্য কোনটা আমরা পছন্দ করি, কোনটা আমরা অপছন্দ করি-এটা বলে দেয়ার জন্য রয়েছে ৯ হাজার ছোট সেল। এগুলোকে যথারীতি সাহায্য করার জন্য রয়েছে আরো ১ কোটি ৩০ লক্ষ নার্ভ সেল। শরীরের বাইরের বস্তুগুলোর অনুভূতির জন্য দিয়ে রাখা হয়েছে ৪০ লক্ষ বহুমুখী সেল। এগুলোই আমাদের বলে দেয় কোনটা গরম, কোনটা ঠান্ডা, কোনটাতে কষ্ট লাগে, কোনটাতে আরাম অনুভূত হয়। এসব মেশিনপত্র সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য মানবদেহের প্রয়োজন পর্যাপ্ত জ্বালানি শক্তির। একজন স্বাস্থ্যবান লোক গোটা জীবনে ৫০ হাজার কেজি পরিমাণ খাবার সংগ্রহ করে। পানীয়ের পরিমাণ হচ্ছে ১১ হাজার গ্যালন। যদি সে শহরের অধিবাসী হয়, তা হলে তার হাঁটার পরিমাণ হবে গড়ে সাত হাজার মাইল। আর যদি সে গ্রামের মানুষ হয় তা হলে তার হাঁটার পরিমাণ হবে ২৮ হাজার মাইল। এ লক্ষ-কোটি সেল, নার্ভ ও জটিল মেশিনপত্রের সমন্বয়ে তৈরি করা মানুষের শরীর। তার জন্য দুটো মূল্যবান বস্তু রয়েছে। একটি হচ্ছে এর কন্ট্রোল রুম বা নিয়ন্ত্রণ-কক্ষ, আরেকটি হচ্ছে জেনারেটর বা শক্তি উৎপাদন-যন্ত্র।

ব্রেন একটি বিস্ময়কর কম্পিউটার

প্রথমে বলি নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কথা। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার কম্পিউটারের চেয়ে হাজার কোটি গুণ জটিল এই ছোট মেশিনটির নাম হচ্ছে ব্রেন। মাত্র তিন পাউন্ড ওজনের এ বস্তুটিকে একটি খুলির মাঝখানে এমনভাবে বসিয়ে রাখা হয়েছে যে, তা গোটা দেহের কোটি কোটি সেনা ও প্রহরীকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। এর প্রতিটি কর্মতৎপর সেলের নাম হচ্ছে নিউরন। প্রতি সেকেন্ডে শত শত নিউরন এসে ব্রেনের প্রথম স্তরে জমা হতে থাকে। এগুলো এতো ক্ষুদ্র যে, এর কয়েক শত এক সাথে একটা আলপিনের মাথায় বসতে পারে। এগুলো হচ্ছে এক একটি ইলেক্ট্রনিক সিগন্যাল-যা শরীরের বিভিন্ন অংশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং মূল নিয়ন্ত্রকের আদেশ পাওয়ার সাথে সাথে হাজার কোটি সেলে ছড়িয়ে দেয়। আমাদের পেছনে যে মেরুদণ্ড রয়েছে, তার মাধ্যমে তার সারা শরীরের যন্ত্রপাতিগুলোকে সজীব ও তৎপর রাখে। এর আবার স্বতন্ত্র কয়েকটি বিভাগ রয়েছে। এক এক বিভাগের উপর একেক ধরনের দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। যেমন কোন অংশকে বলা হয়েছে শোনার জন্য, কোন অংশকে বলা হয়েছে বলার জন্য, কোন অংশকে বলা হয়েছে দেখার জন্য। আবার কোন অংশকে বলা হয়েছে অনুভূতিগুলোকে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল টাওয়ারে ট্রান্সমিট করে দেয়ার জন্য। সর্বশেষ এতে আবার বসানো হয়েছে একটি স্বয়ংক্রিয় শক্তিশালী মেমোরি সেল। যার কাজ নিত্য নতুন সংগ্রহগুলোকে যথাযথ সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজনের সময় তাকে রিওয়াইন করে মেমোরিগুলোকে সামনে নিয়ে আসা। এই স্মৃতি সংরক্ষণশালা প্রতি সেকেন্ডে ১০টি নতুন বস্তুকে স্থান করে দিতে পারে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বপ্রকারের যাবতীয় তথ্য ও তত্ত্বকে যদি এক জায়গায় একত্র করে এ মেমোরি সেলে রাখা যায়, তাতে এর লক্ষ ভাগের এক ভাগ জায়গাও পূরণ হবে না।

 

চলবে……………