আল্লাহ তা’আলার পরিচয় (পর্বঃ ৩)

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন

হাফেয নেছার উদ্দীন

পর্বঃ ১ || পর্বঃ ২ || পর্বঃ৩ || পর্বঃ৪


হার্ট একটি সূক্ষ্ম জেনারেটর

দ্বিতীয় শক্তিশালী বস্তু হচ্ছে জেনারেটর, স্বয়ংক্রিয় শক্তি উৎপাদন যন্ত্র। আমরা একে বলি হার্ট কিংবা হৃদ্‌যন্ত্র। মানব দেহের বাম পাশে সামনের দিকে পেটের একটু উপরে এই ছোট অংশটি হচ্ছে মানবদেহের সর্বাধিক জরুরি অংশ। মানব সন্তানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে এটিই সর্ব প্রথম তৈরি করা হয়েছে। তাই বলা যায় এটিই সৃষ্টির শুরু। আবার এর তৎপরতা বন্ধের মাধ্যমে মানবীয় জীবনের ঘটে অবসান। এ জেনারেটর যখন অচল হয়ে যায় তখন দেহের অন্যান্য সব কটি যন্ত্র চালু থাকলেও মূল মানুষটিকে আর জীবন্ত বলা যায় না। ভিন্নভাবে বললে, এ হার্টই হচ্ছে মানুষের জীবন। এর উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারলে এর ফলে শরীরে অন্যান্য যন্ত্রও মাঝে মাঝে তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন থেকে বিরত হয়ে যেতে বাধ্য হয়। যেমন, শরীরের যে কোটি কোটি সেলকে বলা হয়েছে গরম-ঠান্ডা অনুভব করার কাজে তৎপর থাকার জন্য, এই মনের শক্তির কাছে তা-ও তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই মন কিংবা হৃদয়টাই হচ্ছে মানুষের আসল শক্তি। এটা ভালো তো সব ভালো, এর কথাই আসল কথা। আমরা যে দেহ নিয়ে চলি, যে চোখ দিয়ে দেখি, যে কান দিয়ে শুনি, যে মুখ দিয়ে কথা বলি তার প্রতিটি অংশই হচ্ছে এক-একটি গবেষণার সমুদ্র। চোখ দিয়ে আমরা প্রাথমিক ভাবে যা দেখি তা তো থাকে চিত্রের নেগেটিভ। কোন কুশলী আমাদের ব্রেনে এই চিত্রকে পজিটিভ করে পেশ করে ? কান দিয়ে হাজার কথা একত্রে শুনি কিন্তু কে এর ভিতরে ওয়েভ-গুলোকে সুবিন্যস্ত করে রাখে ? এক কথার সাথে অন্য কথার সংঘাত হয় না কেন ? জিহ্বা দিয়ে যখন কথা বলি তখন তার এক লক্ষ সতের হাজার সেল একত্রে এসে কীভাবে আমার কথাগুলোকে সাজিয়ে-গুছিয়ে দেয় ? কে সেই মহান সৃষ্টি-কুশলী, মানুষ ছাড়া যিনি অন্য কোনো প্রাণীর জিহ্বায় এ সেলগুলো তৈরি করেননি ?

পশু-পাখির বিজ্ঞান

আমরা এসব তথাকথিত বুদ্ধিমানদেরকে ঠিক সেভাবেই আহ্বান করছি যেভাবে আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কে জ্ঞানীদের আহ্বান করেছেন। আমরা এ সংক্ষিপ্ত পুস্তিকায় আল্লাহর একটা নিদর্শন ও বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক আলোচনা করতে পারব না বলে সেদিক যাচ্ছি না। পশুপক্ষী ও মৌমাছির কথাই ধরা যাক। কে শিক্ষা দিল তাকে এ ধরনের কূটকৌশল, এ সম্পর্কে আমরা একজন জগদ্‌বিখ্যাত বিজ্ঞানীর উদ্ধৃতির অংশ-বিশেষ এখানে তুলে ধরছি। নিউইয়র্ক বিজ্ঞান একাডেমীর চেয়ারম্যান বিজ্ঞানী ক্রেসী মরিসন মানুষ একাকী বাস করে না-গ্রন্থে বলেন, আপন জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তনে পাখিকুলের প্রচণ্ড সহজাত ঝোঁক থাকে। তোমার ঘরের দরজার পাশেই যে চড়ুই-এর বাসা, সে শরৎকালে দক্ষিণে চলে যাবে, কিন্তু পরবর্তী বসন্তেই সে ফিরে আসবে। সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের (অর্থাৎ আমেরিকার) অধিকাংশ পাখি দক্ষিণ দিকে চলে যায়। অধিকাংশ সময় তারা সমুদ্রের উপর দিয়ে প্রায় হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে। কিন্তু তারা তাদের পথ হারায় না বা ঠিকানা ভুলে না। আর পত্রবাহক পায়রা যখন কোন দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণকালে নিত্য-নতুন শব্দ শুনতে শুনতে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, তখন ক্ষণিকের জন্য আশ-পাশে চক্কর দেয় এবং তার পরেই সে নিজের গন্তব্য স্থানের দিকে নির্ভুলভাবে পাড়ি জমায়।

প্রকৌশলী মৌমাছির সূক্ষ্ম কৌশল

গাছ-পালার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়-ঝঞ্ঝা যখন মৌমাছির পরিচিত সকল আলামত নষ্ট করে দেয়, তখনও মৌমাছি পালনে ব্যবহৃত কাঠামোতে বিভিন্ন আকারের বহু সংখ্যক কক্ষ বানায়। এগুলোর মধ্য থেকে ছোট ছোট কক্ষ সাধারণ শ্রমিকদের এবং সবচেয়ে বড়টি হচ্ছে পুরুষ মৌমাছির জন্য। রানি মৌমাছি পুরুষদের জন্য নির্ধারিত কুঠরিগুলিতে অনুৎপাদনশীল ডিম পাড়ে, অথচ স্ত্রী জাতীয় শ্রমিক মৌমাছিও অপেক্ষমাণ রানি মৌমাছিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলোতে উৎপাদনশীল ডিম পাড়ে। আর যে সব স্ত্রী জাতীয় মৌমাছি নতুন প্রজন্মের আগমনের অপেক্ষায় দীর্ঘ দিন কাটানোর পর স্ত্রীর ভূমিকায় পরিবর্তিত দায়িত্ব গ্রহণ করে, তারা শিশু মৌমাছির জন্য খাদ্য তৈরি করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। মধু ও তার রেণু চিবানোর অগ্রিম পরিপাকের মাধ্যমে তারা এ কাজটি সম্পন্ন করে। এরপর পুরুষ ও স্ত্রী মৌমাছিদের বয়স বাড়ার পর এক পর্যায়ে তারা চিবানো ও অগ্রিম পরিপাকের কাজ থেকে অবসর নেয়। তারা তখন মধু ও রেণু ছাড়া আর কিছুই অন্যদের খাওয়ায় না। যে সকল স্ত্রী মৌমাছি এভাবে কাজ করে, তারা শ্রমিকে পরিণত হয়। রানি মৌমাছির কক্ষগুলিতে যেসব স্ত্রী-মৌমাছি থাকে, তাদের জন্য খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত থাকে চিবানো ও অগ্রিম পরিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আর এ কাজ যারা করে তারা একদিন মৌমাছিদের রানি হয়ে যায়। পরে শুধু এরাই উৎপাদনশীল ডিম পাড়ে। এই পৌনঃপুনিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য বিশেষ বিশেষ কক্ষ ও বিশেষ বিশেষ ডিমের প্রয়োজন হয়। অনুরূপ খাদ্য পরিবর্তনের বিস্ময়কর প্রভাবেরও প্রয়োজন হয়। আর এ প্রক্রিয়া সমূহের জন্য যা অত্যাবশ্যক, তা হলো ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করা, বাছ বিচার করে খাদ্যের কার্যকারিতা সংক্রান্ত তথ্য বাস্তবায়ন করা। এই পরিবর্তনগুলো বিশেষভাবে একটি সামষ্টিক জীবনে কার্যকর হয়, যা তাদের অস্তিত্বের জন্যই অপরিহার্য। এ জন্য যে জ্ঞান ও দক্ষতা অত্যাবশ্যক, তা এ সামষ্টিক জীবন শুরু করার পর অনিবার্যভাবে অর্জিত হয়ে যায়। অথচ এই জ্ঞান ও দক্ষতা জন্মগতভাবে কোন মৌমাছির সত্তা ও তার টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য নয়। এ থেকে বুঝা যায় যে, বিশেষ বিশেষ অবস্থায় খাদ্যের কার্যকারিতা সংক্রান্ত জ্ঞান মানুষের চেয়েও মৌমাছির বেশ। কি বিস্ময়কর পরিকল্পনা ! কে এই পরিকল্পনার ইঞ্জিনিয়ার ? বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন লোক উচ্চকণ্ঠে বলে উঠবে যে, একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ এটা করতে পারেন। অন্য কারো দ্বারা এটা সম্ভব নয়। বোকা নাস্তিকরা বলে এটা নাকি প্রকৃতি। কিন্তু প্রশ্ন, এই প্রকৃতিটা কে তৈরি করল ? এ ধরনের প্রশ্ন আর উত্তর চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত একখানেই গিয়ে শেষ হবে, তা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন- আপনার পালনকর্তা মধুমক্ষিকাকে আদেশ দিলেন : পর্বত-গাত্রে, বৃক্ষ এবং উঁচু ডালে গৃহ তৈরি কর, এরপর সর্বপ্রকার ফল মূল থেকে ভক্ষণ কর এবং আপন পালনকর্তার উন্মুক্ত পথসমূহে চলমান হও। তার পেট থেকে নিঃসৃত হয় নানাবিধ পানীয়, তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার, নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (সুরা নহল, আয়াত: ৬৯)

মধুর মধ্যে নিহিত প্রকাশ্য ও গোপন সত্য

মধু সম্পর্কে আল্লাহ পাকের বাণীতে বলা হয়েছ:

ثُمَّ كُلِي مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلًا يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ (النحل: 67

মানুষের জন্য আরোগ্য। (সুরা নহল: ৬৯)

এখানে আল্লাহপাক আরোগ্যের কথা বলেছেন কিন্তু কোন বিশেষ অসুখের নাম নেননি। অতএব এর ব্যাপ্তি বিশাল। এর ক্ষেত্র সীমিত নয়। অসীম। বরং মানুষের যাবতীয় ব্যাধি বলতে শারীরিক, মানসিক, আত্মিক-সবই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কারণ মানুষ একাধারে বস্তু ও আত্মার সমষ্টি। আর এ জন্যই সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা‘আলা এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যত প্রকারের অসুখ মানুষের হোক না কেন, তার সূচনা হয় তার মন বা আত্মা থেকে এবং তার পরিণতি বা প্রতিক্রিয়ায় দেহ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। এখন আসুন, আমাদের জ্ঞান ও চিন্তাশক্তি অনুযায়ী মধুর মধ্যে নিহিত মূল রহস্য সম্পর্কে বুঝতে গিয়ে, তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থার পর্যালোচনা করে, দেখি। “সকল মানুষের মানুষের জন্য আরোগ্য – এ কথাটি দ্বারা আল্লাহ তাআলা বুঝাতে চেয়েছেন : মধু মানুষের অন্তরাত্মা, জীবন এবং শরীরের জন্য আরোগ্য বা নিরাময় দানকারী। কিন্তু কীভাবে ? এ প্রসঙ্গে মধুর সৃষ্টি এবং মৌচাকে যে নির্মাণ কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে তা বুঝার জন্য নিজেদের চিন্তাশক্তিকে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহ তাআলা মৌমাছির নিকট এলহামের মাধ্যমে জানিয়েছেন- খাও সকল ফলমূল থেকে ।

অর্থাৎ, সকল প্রকার ফলের নির্যাস থেকে খাও এবং সেই সব নির্যাসের মধ্যে নিরাময়কারী সুধা তোমাদের পেটের কারখানাতে রেখে তাকে শক্তিশালী কর। আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে ঐ আহরিত নির্যাস অবশেষে মানবমণ্ডলীর ব্যাধি সমূহের জন্য পরম আরোগ্য দানকারী মধুতে পরিণত হয়। ফুলের রস, পাতা এবং বৃক্ষ ছাল ও মূল থেকে মধু হয় না। এই সঞ্জীবনী সুধার জন্য বিশ্ব-সম্রাটের নির্দেশে বিশেষ বিশেষ উপাদান সমন্বয়ে প্রক্রিয়াকরণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। আর এ জন্যই এই সুধার মাঝে কোন ভেজাল, ভ্রান্তি বা ত্রুটির কোন সম্ভাবনা নেই। একটু চিন্তা করে দেখুন, পৃথিবীর সকল চিকিৎসাবিদ একত্রিত হয়ে কোন রোগীর জন্য যদি কোন ওষুধ নির্বাচন করে, তবু তারা নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারবে না যে ঐ ওষুধ শতকরা একশত ভাগ কার্যকরী হবে, অথবা ঐ ঔষধের কোন প্রতিক্রিয়া হবে না। আজকের উন্নত বিশ্বের ডাক্তারগণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছেন বলে দাবি করেন, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এক রোগের ওষুধ হয়তো ঐ রোগকে উপশম করছে, কিন্তু তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আরও বহু অসুখের জন্ম দিচ্ছে। অথচ মধু সম্পর্কে সবজান্তা ও সর্বময় ক্ষমতার মালিক নিজেই ঘোষণা দিচ্ছেন-“মানবমণ্ডলীর জন্য আরোগ্য”। যেমন সবাই জানেন, মৌমাছিরা সর্বপ্রকার সবুজ বৃক্ষের ফুলের খুশবু এবং ওইসব গাছ-গাছালির মধ্যে নিহিত জীবনী শক্তিসমূহ ভক্ষণ করে নিজেদের পেটের মধ্যে এক বিশেষ স্থানে লালা তৈরি করে, আর তাকেই আমরা মধু বলি। সুতরাং, বুঝা গেল সর্বপ্রকার ফল ফুল এবং ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে উৎপন্ন পত্রপল্লবের স্বাদ ও গন্ধ সমন্বয়ে-স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলার অদৃশ্য তত্ত্বাবধানে তৈরি হয় এই মহামূল্যবান পানীয়। এসব গাছপালা, ফল ও ফুলের মধ্যে অবস্থিত খুশবু ও স্বাদের সঠিক উপকারিতা বা তাৎপর্য খুব কম মানুষই জানে বা চিন্তা করে। এজন্য যারা মধু সেবন করে তাদের আত্মা ও মেধা-মননের গভীরে মধু প্রভাব বিস্তার করে। তারপর এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং প্রতিটি লোমকূপে। অত:পর আত্মা ও অবয়বে মধু ক্রিয়াশীল হয়ে উঠে। এর মধ্যে অন্তর্নিহিত পবিত্র প্রাণশক্তি সর্বাগ্রে মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং ঐ বিশুদ্ধ রক্তের প্রবাহ ছড়িয়ে দেয় সকল ধমনিতে, ফলে পবিত্রতার এ অমিত তেজ এবং অদৃশ্য অমোঘ শক্তি উদ্দীপ্ত করে অকল্পনীয়ভাবে এবং মুক্ত করে তাকে বহু জটিল রোগ ব্যাধি থেকে। আল্লাহপাক পাক কোরআনে মধুর বিভিন্ন রঙের উল্লেখ করেছেন।

এইভাবে রং মানুষের জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগে। আমাদের মন মস্তিষ্কের মধ্যে চিন্তা করার জন্য যে কোষগুলি কাজ করে সেগুলির উপর সৃষ্টি জগৎ এবং তার বাহির থেকে আগত জ্যোতি এবং নুরের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। রং এবং মধুর উজ্জ্বলতার মধ্যে রয়েছে আরোগ্য দান করার জন্য সর্বপ্রধান ভূমিকা ; তাই এরশাদ হচ্ছে-এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রং, (যা) আরোগ্য মানবমণ্ডলীর জন্য।”(সুরা নহল: ৬৯ ) সেই বিখ্যাত লেখক মি. ক্রেসী মরিসন তাঁর গ্রন্থে আরো যেসব উদাহরণ পেশ করেছেন তার মধ্যে কুকুরের অনুসন্ধানী নাক সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। অথচ মানুষ আজ পর্যন্ত এমন কোন যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারেনি, যা তার নিজের দুর্বল ঘ্রাণশক্তিকে তীব্রতর করতে পারে। তিনি আরো বলেছেন, জলজ মাকড়সা নিজস্ব জাল দিয়ে নিজের জন্য বেলুন আকৃতির যে বাসা তৈরি করে থাকে, তা মানুষের চিন্তা-শক্তিরও অনেক ঊর্ধ্বে।

সলোমান মাছ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, কীভাবে বছরের পর বছর সমুদ্রে কাটাবার পর এই মাছ তার জন্মস্থান নদীতে ফিরে আসে। তার চেয়ে আরো বিস্ময়কর ঘটনা এ লেখক উল্লেখ করেছেন। তা হচ্ছে জলজ সাপের বিস্ময়কর সফর। এ সাপের স্বভাব ঠিক সলোমান মাছের বিপরীত। এই প্রাণীটি বয়স হলেই নিজ পুকুর, নদী, খাল-বিল হতে হিজরত করে পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে চলে যায়। এই ধরনের আরো অনেক তথ্য দিয়ে তিনি তাঁর গ্রন্থকে একটি বিস্ময়কর গ্রন্থে পরিণত করেছেন। সত্যিই মহান আল্লাহর এই কুদরতি, সৃষ্টি-কুশলতা ও কারিগরি নৈপুণ্য তাঁর অস্তিত্বকে বিশ্বাস করতে মানুষের বিবেককে বাধ্য করে।

রেশম বা তুঁত পোকা

তাহলে বল, তোমাদের প্রভুর কোন নেয়ামত তোমরা অস্বীকার করবে ? (সুরা আর রাহমান) আল্লাহ তাআলার অগণিত নেয়ামতের মধ্যে রেশম বা তুঁত পোকা এক উত্তম নেয়ামত। রেশম পোকা, তার নিজেরই দেহ নিঃসৃত আঠা দ্বারা কত মজবুত, মোলায়েম মসৃণ ও সুন্দর সোনালি রঙের সুতা তৈরি করে, যা চিন্তা করলে হয়রান হতে হয়। অথচ মানুষ ঐ সুতা লাভ করার জন্য কত নির্দয়ভাবে সেই পোকা হত্যা করে। সেই সুতা দিয়ে মূল্যবান কাপড় তৈরি করে ব্যবসা করে এবং অর্থ রোজগার করে। নিষ্পাপ এই ক্ষুদ্র কীটটি মানুষের জন্য মূল্যবান সুতা সরবরাহ করা ছাড়া জ্ঞান ও কৌশলগত কত শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরে, সচরাচর কেউ হিসাব করে না। সুতা বানাতে গিয়ে তাকে কোন্‌ কোন্‌ পর্যায় অতিক্রম করতে হয়, আর সেই বুদ্ধি হিকমতের পিছনে কোন সে মহান কুশলীর অদৃশ্য হাত কাজ করে, তা অপরিণামদর্শী লঘুচেতা ও ভাসা ভাসা জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ হিসাব করে না। যদি ঐ কীটের সূক্ষ্ম জ্ঞান ও বুদ্ধির কথা মানুষ চিন্তা করত, তাহলে সে তার মনযিলে মকসুদ, অর্থাৎ আখেরাতের জিন্দিগির রহস্য বুঝতে পারতো, অনুধাবন করতে পারতো আল্লাহর পক্ষ থেকে কোরআন হাদিসের মাধ্যমে প্রদত্ত জীবন পদ্ধতির তাৎপর্য ও উপকারিতা। সর্বোপরি জানতে পারতো সবকিছুর পিছনে দয়াময় পরওয়ারদেগারের জ্ঞান, ইচ্ছা ও হিকমত প্রচ্ছন্ন থাকার কথা এবং এর ফলে বহুলাংশে বৃদ্ধি পেত তার ঈমান ও সত্যপথে টিকে থাকার অবিচলতা। এবার আমরা সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে দেখি ঐ ক্ষুদ্র কীটের মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত ইলহামী জ্ঞানের দিকে। মহান রব্বুল ইজ্জতের অদৃশ্য ইশারাতে ঐ পোকা খায় আঠাযুক্ত পত্রপল্লব, যেমন কুল বা বরই পাতা, তুঁত-পাতা ইত্যাদি। এসব আঠাযুক্ত পাতা তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করে সেখানে অবস্থিত আরও কিছু উপাদানের সংমিশ্রণে এই মূল্যবান সুতা তৈরি হয় এবং তাকে জীবন সঞ্জীবনী নেয়ামতের অধিকারী বানায়। এইভাবে প্রকাশ পায় তার মাধ্যমে আল্লাহ পাকের করুণারাশির ঝরনাধারা। রেশম-কীট জন্ম-লগ্নে ছোট একটি পিঁপড়ার মত ক্ষুদ্র থাকে এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে, বসন্ত সমাগমের সাথে সাথে দিবালোকে বেরিয়ে আসে। এ সময়ে গাছে গাছে দেখা দেয় পত্রপল্লবের কুঁড়ি ও কচি-কচি মনোরম পাতা। রেশম কীটের এই বাচ্চাগুলি ঐ তুলতুলে পাতাগুলি খেতে খেতে দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে এবং শীঘ্রই পূর্ণ পোকায় পরিণত হয়। তারপর রাব্বুল আলামিনের অদৃশ্য ইশারায় নিরাপদ বাসস্থান লাভের আশায় ঘর তৈরির দিকে তারা পারপূর্ণ মনোযোগ দেয়। সে ঘর এমনই সুপরিকল্পিত ও সুগঠিত এবং এত সুন্দর যে, দেখলে মনে হয়-এ ঘরের পূর্ণ ছবি তার নিজের মধ্যে খোদিত ছিল এবং সেটাই এখন বাস্তবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এভাবে ঘরগুলি নজরে পড়তে থাকে। এসব ঘরের মধ্যে তারা আরামে শুয়ে পড়ে এবং মুখ নিঃসৃত আঠা দ্বারা প্রস্তুত সূক্ষ্ম সুতার বেষ্টনী দিয়ে ঘরের আচ্ছাদন বাড়াতে থাকে। ঘরের একটি অংশ হাওয়া বা অক্সিজেন প্রবেশের জন্য খোলা রাখে। কবুতরের ডিমের মত ঘরের প্রস্তুতিকাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে ক্লান্ত-শ্রান্ত কীটগুলি পরিপূর্ণ বিশ্রামের জন্য নিষ্ক্রিয় হয়ে শুয়ে পড়ে। এরপর শীত মৌসুমের আগমনে কীটগুলি নিজ নিজ ঘরের মধ্যেই অদৃশ্য জগতের উদ্দেশ্যে উধাও হয়ে যায়।

কী মজার ব্যাপার ! ফেব্রুয়ারি মাসের একুশ তারিখ পড়ার সাথে সাথে, হঠাৎ করে দেখা যায়, পোকাগুলি নিজ নিজ ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে এবং তাদের বাচ্চাদেরকে ডিম থেকে বের করে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ছেড়ে দিচ্ছে। এখন একটু চিন্তা করে দেখুন, শীত আসছে-কে পূর্বাহ্নে তাদেরকে একথা জানিয়ে দেয় যে জন্য তারা শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে তড়িঘড়ি ঘর বানাতে শুরু করে। এবং এত চমৎকার ও মজবুত কেল্লার মত ঘর বানাতে তাদেরকে কে শেখায় ! কে তাদের কে তিনটি মাস ধরে অভুক্ত অবস্থায় বাইরের আলো বাতাস থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখে ! কে দেয় তাদেরকে এ জ্ঞান বুদ্ধি ও হিকমত ! আবার ফেব্রুয়ারি মাস আসার সাথে সাথে কে তাদেরকে ঐ গভীর নিদ্রা থেকে জাগিয়ে কর্মতৎপর করে তোলে ! আসুন, ঊর্ধ্বলোকে সফরের সাথি ভাইয়েরা, এই রেশম কীটদের প্রদত্ত গায়েবি জ্ঞান সম্পর্কে একবার চিন্তা করুন এবং ভাবুন, কে নিয়ন্ত্রণ করছে আপনাকে, আমাকে, সবাইকে এবং দুনিয়ার সকল সৃষ্টিসমূহকে।

চলবে……………………